রবিশঙ্কর মৈত্রী।।

বাঙালরা বাড়িতে আগত অতিথিকে মুখের উপরে কিছু বলতেও পারেন না সইতেও পারেন না। অতিথিও অবিবেচকের মতো একটানা সাতদিন দশদিন শুয়ে বসে গড়িয়ে পাড়িয়ে ভালোমন্দ খেয়ে নিজবাড়িতে ফিরে আপ্যায়নের ত্রুটি নিয়ে গালগল্প করে শান্তি পান। এসবই বাংলাদেশে ঘটে।

বাংলাদেশ ছাড়া অন্যান্য দেশে অতিথি অত্যাচার নেই বললেই চলে। ফরাসি দেশে অতিথি এসে কারো বাড়িতে না উঠে হোটেলে ওঠেন, তারপর আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে দেখা করেন, এবং লাঞ্চ কিংবা ডিনার করেন। ফরাসি দেশেও কারো বাড়িতে বাড়তি ঘর তেমন থাকে না। তাঁদের প্রতিদিনের রুটিন জীবনটাকে অতিথি এসে লণ্ডভণ্ডও করে দেন না।

কোলকাতায় আমার মামাবাড়ি। নিতান্তই সমস্যায় না পড়লে আমি মামাবাড়িতে থাকিনি কোনোদিন, কোলকাতায় হোটেল বা গেস্ট হাউজেই থাকা সমীচীন বলে মনে করেছি।
পশ্চিমবঙ্গের বাঙালরা এখনো অতিথিপরায়ণ, কিন্তু আর্থিক অস্বচ্ছলতা এবং বাড়িতে বাড়তি শোবার ঘর না থাকায় তাঁরা দেশ থেকে যাওয়া মেডিকেল ট্যুরিস্ট আত্মীয়স্বজনকে মুখের উপরে না করতে পারেন না বলে ভেতরে ভেতরে খুব অশান্তি অস্বস্তিতে ভোগেন। এখন অবশ্য পশ্চিমবঙ্গের বাঙালরাও দিনে দিনে বদলে যেতে বাধ্য যাচ্ছেন।

কোলকাতায় এবং আশপাশের শহরতলিতে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে গেলে এক কাপ লিকার
চায়ের সঙ্গে একটা বিস্কুট দিয়ে দেন কাপের পাশেই। আমার খুব রাগ হয়– মনে মনে বলি, এ কী অভদ্রতা?

বাংলাদেশে গেস্টকে চায়ের সঙ্গে বিস্কুট চানাচুর আঙুর আপেল কমলাসহ অনেক কিছু দেওয়া হয়, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গবাসীরা এতো কিপ্টামি করেন কেনো?

এখন আমরা ফ্রান্সপ্রবাসী। আজকাল আমাদের ফরাসি বন্ধু ভালোই জুটেছে– এ দেশে বন্ধুর বাড়িতে গেলে চা কিংবা কফির পাশেই একখানা বিস্কুট পাওয়া যায়। নিমন্ত্রণ করলে টেবিলে তিন চার পদের বেশি থাকে না। ফরাসিদের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গবাসীর কিছু মিল আমি এরই মধ্যে খুঁজে পেয়েছি।

দুঃখিত, পশ্চিমবঙ্গবাসী ঘটি এবং বাঙাল আত্মীয়স্বজনবৃন্দ, আপনারাই ঠিক আছেন, শুধু শুধু আপনাদেরকে কৃপণ বলে ছোটো করেছি।

আমরা বাংলাদেশের বাঙালরা অতিথিবৎসল, এটাই আমাদের ঐতিহ্য– কিন্তু যে বাড়ির শিশুরা স্কুলে যায়, মা বাবা অফিস করে, থাকার ঘরেও বাড়তি বিছানা নেই– তাদের জন্য অতিথি-ঐতিহ্যটা অত্যাচারের চাইতেও বেশি বলে মনে হয়। বাঙালরা বদলাবেন নাকি মুখ বুজে অতিথি অত্যাচার সহ্য করবেন, জানি না। আমিও বাঙাল, আমাকে বদলে নিতেই হবে, ধীরে ধীরে।

লেখক: সাংবাদিক

ইউডি

কোন মন্তব্য নেই

মতামত দিন