প্রেম স্বর্গ হতে আসে আবার স্বর্গেই মিলিয়ে যায়

খুজিস্তা নূর-ই–নাহারিন মুন্নি ।।

মানুষের শাশ্বত চাওয়া আর জীবনের সবচেয়ে সুন্দরতম অধ্যায় হচ্ছে প্রেম। প্রতিটি প্রেম স্বর্গ হতে আসে আবার স্বর্গেই মিলিয়ে যায়। বিশ্বাস, সম্মান, শ্রদ্ধায় যখন দু’টি আত্মার মিলন হয় তখনই প্রেম বলে।

প্রকৃতিতে তিন ধরণের প্রেম হয়। প্রথমত দৈহিক প্রেম, দ্বিতীয়ত আবেগিও প্রেম, তৃতীয়ত একে অপরের প্রতি কেবলই নির্ভরতা। প্রথম ধরনের প্রেমটি বংশ বিস্তার কল্পে সমস্ত প্রাণী কুলের জন্য নির্ধারিত। দ্বিতীয় আর তৃতীয় ধরণের প্রেম কেবলই অনুভূতি আর বিবেক সম্পন্ন মনুষ্য প্রজাতির জন্য।

গ্রিক মাইথলজি অনুসারে প্রথম ধরণের প্রেমকে দেবতা কিউপিডের নামে নামকরণ করে বলা হয় ” প্রেম অন্ধ”। কারণ সে অবুঝ , আনপ্রিডিকটাবল, বেহিসাবি। আধুনিক বিজ্ঞান মতে ভালোবাসা হরমোনের প্রভাবে মস্তিষ্কের এক ধরণের রাসায়নিক ক্রিয়া-বিক্রিয়া প্রসূত ফল (ইফেক্ট অফ ডোপামিন)।

ধর্মীয় ইতিহাসে হয়তো এই ফলটি কেই গন্ধম আখ্যা দিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত করা হয়েছিল। বিজ্ঞানের অভিমত প্রেমের ক্ষেত্রে মানুষের মস্তিষ্ক চাওয়া-পাওয়া, পছন্দ, আকর্ষণ, আবেগের সব কিছুর সম্মিলনে একটি ছকে ফেলে হিসেব কষে অতঃপর প্রেমে পরে। প্রেমিক অথবা প্রেমিকা কতোটা সুন্দরী, শিক্ষিত, স্মার্ট, মিষ্টিভাষী, কৌতুক প্রিয়, কতটুকু আস্থাশীল সব মিলিয়েই প্রেম হয়। তবে কি প্রেমেও অংক থাকে ! এই যে এতো কবি সাহিত্যিকরা প্রেম নিয়ে এতো গল্প, কবিতা, উপন্যাস লিখে গেছেন সবই কি মস্তিষ্কের কেমিক্যাল রিএকশনে সৃষ্ট। প্রেমিকাকে না পেয়ে পাগল প্রায় প্রেমিক দেবদাসের যে আত্মাহুতি তা কি কেবল শরত বাবুর মস্তিষ্কের ক্রিয়া-বিক্রিয়া ! কিংবা

রবি ঠাকুর লিখেছেন, ”প্রেম এসেছিলো নিঃশব্দ চরণে, তাই স্বপ্ন মনে হল তারে, দেইনি তাহারে আসন”। নজরুল লিখেছেন, ” আলগা কর গো খোঁপার বাঁধন, দিল অহি মেরী ফাঁস গেয়ই ”। একদা কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ কে নিয়ে যে তসলিমা নাসরিনের যে অশ্লীল শব্দ চয়ন, তা কি কেবল তাঁর মস্তিষ্কে প্রেমের এই নিঃসরণের প্রভাব! সব কিছুই কি মস্তিষ্কে সৃষ্ট ডোপামিনের একশন! কবি সাহিত্যিকরা যে সৃষ্টি শীল হয়, বহিমিয়ান হয় অনেকে আবার বিধ্বংসী হয় সবকিছুই কি কেবলই মস্তিষ্কের রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফসল! প্রেমকে যতই আমরা হৃদয় বৃত্তিও বলি আসলে প্রেম মূলত মাথায়ই থাকে। অন্তত আজকের বিজ্ঞান তাই বলে।

রবি ঠাকুরের বিখ্যাত গান ”আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল, শুধাইল না কেহ” মূলত মস্তিষ্কেরই কারসাজি। কারণ হৃদয় বলতে যে আবেগ বুঝায় তাও মস্তিষ্ক থেকেই উৎসরিত। তৃতীয় ধরণের প্রেমে ডোপামিন নয় পুরোটাই মস্তিষ্কের হিসেব-নিকেশ। আনমনে নিজের সাথে অন্যের মিল খুঁজে নেওয়া। সেখানে ব্যক্তিত্ব, রুচি, শিক্ষা, অবস্থান, ম্যাচিউরিটি, পছন্দ- অপছন্দ, নিশ্চয়তা সব কিছুই মনের অলক্ষ্যে কাজ করে। পৃথিবীতে সমস্ত হিসেব নিকেশের ঊর্ধ্বেও কিছু মানুষ, আপাদ দৃষ্টিতে কিছু অসম প্রেমও দেখা যায়।

যেমন চার্চ আর ক্যামিলা, অষ্টম এডওয়ার্ড ও মেরী ওয়ালিস সিম্পসন আরও অনেক জানা অজানা প্রেম কাহিনী। তাঁরা প্রেমের জন্য বৃহত্তর স্বার্থ ত্যাগ করতে মুহূর্তের জন্যও বিন্দু মাত্র দ্বিধা করেননি। পরবর্তীতে নেই কোন আফসোস। এদের সংখ্যা নগণ্য হলেও প্রকৃত প্রেম এদের ক্ষেত্রেই ধারণা করা হয়। প্রেমের রসায়ন যাই হোক, সর্ব কালে প্রেমের জন্য আহাজারি প্রতিটি মানুষের মাঝেই বিদ্যমান। কারণ স্রষ্টা নাকি মনুষ্য প্রজাতির আদিতে ৪ হাত ৪ পা বিশিষ্ট করে সৃষ্টি করেন, পরে দ্বিখণ্ডিত করে পৃথক করে দুই দিকে ফেলে দেন। শুরু হয় গিমিক একে অপরকে খুঁজে ফেরা । এই দীর্ঘ যাত্রায় যারা সঠিক জুটি খুঁজে পান তাঁরা ভাগ্যবান। আর অপর গ্রুপ গোলক ধাঁধায় পরে আজীবন শুধু খুঁজতে থাকেন। কখনো মনে হয় এইতো পেয়ে গেছি পর মুহূর্তে মনে হয়, ” না এ আমার নয় ”। প্রেমের জন্য এই দীর্ঘশ্বাস আর এই হাহাকার স্রষ্টার সবচেয়ে বড় চমক কারণ এই অতৃপ্তি আর না পাওয়াই মানুষকে তাড়িত করে, চিন্তাশীল করে, সৃষ্টিশীলতা বাড়ায়।

যারা সারা জীবন খুঁজে ফিরে তাঁরা বলে প্রেমটা আসলে অভিশাপ, যেই মুহূর্তে প্রেমের মিষ্টতাটুকু খুঁজে পায় তখন বলে সৃষ্টি কর্তার সেরা উপহার। প্রেমে রাগ-অনুরাগ থাকবে, বিরহ-বেদনা থাকবে, পাওয়ার আকুতিটুকু থাকবে। সুচিত্রা সেনের মত মধুর স্বরে বলবে ” কিছুক্ষণ আরও না হয় রহিলে কাছে”!

এসএম

কোন মন্তব্য নেই

মতামত দিন