সন্দেহ এখনো স্থির মিতুর বাবার

ইসমত মর্জিদা ইতি, চট্টগ্রাম ।।

মেয়ে মিতুর খুনী হিসেবে সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের প্রতিই সন্দেহের তীর স্থির রেখেছেন মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেন। আজ অবধিও তিনি জানিয়েছেন তার মেয়ের খুনের পিছনে বাবুল আক্তারের হাত রয়েছে। একই সাথে দুষছেন নিজের ভুলকে।

তিনি বলেছেন, পিতা হিসেবে তার দোষ, তিনি সঠিক দায়িত্ব পালন করেননি। মেয়ের নিয়মিত খোঁজখবর নেননি। মিতুর বাসা চট্টগ্রামে নিয়মিত আসেননি। নিয়মিত যাতায়াত থাকলে মেয়েকে নিয়ে তার জামাই ও শ্বশুড়বাড়ির লোকের আগাম ষড়যন্ত্রের তথ্য আগাম জানতে পারতেন।

মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেন আজ(শুক্রবার) সন্ধ্যায় মুঠোফোনে বলেন, মিতু  ফোন করেই ‘ও আব্বু’ বলে ডাক দিতো। মিতু যেদিন খুন হয়, সেদিন তিনি বরিশাল ছিলেন। মিতু মারা যাওয়ার ২ থেকে ৩ দিন আগে মিতুর সাথে বাবুল আক্তারও ফোনে তার সাথে কথা বলেন।

সেদিনের কথা বর্ণনা করে তিনি বলেন, বাবুল আক্তার শ্বশুড় হিসেবে তাকে খুব বেশি সমীহ করতেন না। খুব কম কথা হতো ফোনে। তাও অনেক মাস পরপর। সেদিন ফোনে বাবুল আক্তার অতি উৎসাহী আগ্রহী তার সাথে কথা বলেন। আর বাবুল আক্তার জানতো আমি বরিশালে। ফোনে আমাকে বলে, আব্বা, আমি তো বাসা ঢাকায় শিফট করব। আগে মাহির-তাপুরের স্কুল ঠিক করব, তারপর বাসা ঠিক করব। মিতুও সেদিন ঢাকায় আসা নিয়ে তার সাথে সাথে অনেকক্ষন কথা বলেন।

মোশাররফ হোসেন আগের বলা সেইসব প্রসঙ্গই আবার ঘুরে ফিরে আবার বলেন, আমার মিতু মাকে বাবুল আর তার বাবা-মা খুব প্রেসারে রাখতো। বাবুল আক্তার সৎ অফিসার বলে মিতুকে বেতনের টাকা থেকে সংসারের যে খরচ দিতো, তা দিয়ে সংসার চালাতে মেয়ের কষ্ট হতো। রেশনের জিনিসপত্র থাকাতে রক্ষা হলেও মেয়ের হাত খরচের কোনো টাকা বাবুল দিতো না।

তিনি আরো বলেন, আমি প্রতিমাসে আমার মেয়েকে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা হাত খরচের জন্য পাঠিয়েছি। বাবুল মেয়ের আমার কোনো শখ পূরণ করেনি। মিতু মারা যাওয়ার পর মিতুর ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা দামের কোনো শাড়ি কিংবা দামী ল্যাগেজ, সুটকেস পাওযা যায়নি। আমি তখন ভেবেছি, আমার জামাই সৎ অফিসার। মেয়ে কষ্টে আছে এটা জেনে কষ্ট না পেয়ে গর্ব করেছি। কিন্তু এখন তো শুনি বাবুল আক্তারের নাকি কোটি কোটি টাকা। আর এ টাকার ভাগ আমার মেয়েকে না দিতেই তাকে খুন করা হয়েছে।

আফসোস করে মোশাররফ হোসেন বলেন, নিজের ভুলের জন্যই মেয়েটাকে হারালাম। আমি যখন মাগুরায় ওসি ছিলাম, বাবুলের বাড়ির চৌদ্দগোষ্ঠীর সবার খবর জানতাম। তারপরও ছেলে উচ্চশিক্ষিত দেখে মেয়ে বিয়ে দিয়েছি। কিন্তু আমার মেয়ের পড়াশুনা কম ছিল বলে কাজের মেয়ের মতো খাটিয়ে নিয়েছে।

ঝিনাইদহে এসআই আকরাম হত্যার সঙ্গে চট্টগ্রামের সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা এসপি বাবুল আক্তার সরাসরি জড়িত। এসআই আকরামের পরিবারের দাবি, বনানী বশির বহ্নির সঙ্গে পরকিয়ার জের ধরে পরিকল্পিতভাবে তার স্বামী এসআই আকরামকে হত্যা করেন বাবুল আক্তার।

শুক্রবার সকাল সাড়ে ১১ টার দিকে স্থানীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নিহত এসআই আকরামের বোন এ অভিযোগ করেন। সাংবাদিক সম্মেলনে বোন রেহানা খাতুন, ফেরদৌস আরা, জান্নাত আরা পরভিন রিনি, শাহনাজ পারভিন রিপা ও শামিমা নাসরিন মুক্তি উপস্থিত ছিলেন।

এ সংবাদ সম্মেলন নিয়ে মোশাররফ হোসেনের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি জানান, আল্লাহতায়ালার কুদরত বোঝা মুশকিল। তার রহমতেই আজ বাবুল আক্তারের অনেক ভিতরের খবর ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। তাদের কানে বিভিন্ন রকম কথা আসছে। আর এসব তথ্য আল্লাহর তরফ থেকেই আসছে।

তিনি আরা বলেন, মিতু হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কামরুজ্জামানের উচিত বহ্নিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা। বাবুল আক্তারের এ বিষয়ে সুপষ্ট বক্তব্য মিডিয়ার সামনে এসে উপস্থাপন করা।

এ বিষয়ে বাবুল আক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে এ নিয়ে জান্নাত আরার অভিযোগের ঘটনা ওঠার পর বাবুল আক্তার তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলেন, উল্লিখিত ঘটনার সময় (আকরাম নিহত) আমি সাউথ সুদানে (জুন ২০১৪-জুন ২০১৫) জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মরত ছিলাম। তা ছাড়া ‘সাদিমুন ইসলাম মুন’ নামে আমার কোনো ফুফাতো ভাই বা পরিচিত কোনো ব্যক্তিও নেই। আমার বাবার দীর্ঘদিনের চাকরি জীবনে তার পোস্টিং কখনো সাতক্ষীরায় ছিল না। উপরন্তু আমার এ যাবতকালের জীবদ্দশায় আমি নিজেও কখনো সাতক্ষীরায় যাইনি।

তিনি আরো বলেন, ঘরে বসে ফেসবুকে বক্তৃতার ঝড় তুললে লোকে আর এখন তার কথা বিশ্বাস করবে না। বুকে সাহস থাকলে সে মিডিয়ার সামনে এসে এর তীব্র প্রতিবাদ জানাক।

ইদানিং বাবুল আক্তার তারও ফোন ধরেন না বলে জানান । মিতুর মেয়ে তাপুরের জ্বর শুনলাম। আজ ছুটির দিন বাচ্চাদের আমাদের কাছে আসতে দেয়নি। জানিনা এখন তাপুরের কি অবস্থা!

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মো: কামরুজ্জামান জানান, মামলার তদন্তের স্বার্থে যাকে যাকে জিজ্ঞাসা করতে হয়, সবাইকে আমি জিজ্ঞাসা করব। তদন্ত তদন্তের নিয়মেই চলবে। মিতুর কিংবা বাবুলের পরকিয়া ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সেখানে যার নাম আসবে , তাকে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতেই হবে বলে জানান তিনি।

প্রসঙ্গত, গত ৫ জুন নগরীর জিইসি মোড় এলাকায় গুলি ও ছুরিকাঘাতে নিহত হন মাহমুদা খানম মিতু। এ ঘটনায় মিতুর স্বামী সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার অজ্ঞাত পরিচয় তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে পাঁচলাইশ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।

এসএম

কোন মন্তব্য নেই

মতামত দিন