• বুধবার, ১৭ আষাঢ় ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ২৮ জুন ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ

নিউইয়র্কে আয়োজিত কর্মশালায় ড. আতিউর রহমান

বাংলাদেশের মূল চেতনার মধ্যেই অন্তর্ভূক্তির ধারণা প্রোথিত রয়েছে

প্রকাশ:  ১৬ জুন ২০১৭, ১৫:২১
নিজস্ব প্রতিবেদক।।

‘স্বাধীন বাংলাদেশের যে স্বপ্ন তার মধ্যে শুরু থেকেই অন্তর্ভূক্তির ধারণাটি প্রোথিত রযেছে’। বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে ইউএনডিপি-এর হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট অফিস (এইচডিআরও) আয়োজিত কর্মশালায় ‘ফাইনান্সিয়াল ইনক্লুশন এন্ড ইনক্লুসিভ গ্রোথ: দি সাকসেস স্টোরি অফ মোবাইল ফাইনান্সিয়াল সার্ভিসেস’ শিরোনামে নিবন্ধ উপস্থাপনা করার সময় এ কথা বলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান। 

কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন এইচডিআরও-এর সভাপতি ড. সেলিম জাহান এবং অংশ নেন ঐ কার্যালয়ের কর্মকর্তারা। ইউএনডিপির অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রতিনিধিরাও এই কর্মশালায় অংশ নিয়েছেন। এ সময় ড. আতিউরের বক্তব্য লাইভ স্ট্রিমিং-এর মাধ্যমে ইউএনডিপি কার্যালয়ের সকল বিভাগে এবং বিশ্বের সকল দেশে ইউএনডিপির স্থানীয় কার্যালয়গুলোতে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের সভাপতির আয়োজনে তিন দিনব্যাপী “অবকাঠামো অর্থায়ন” বিষয়ক সম্মেলনে যোগদান শেষে ড. আতিউর এইচডিআরও-তে এই কর্মশালায় অংশ নেন।

তিনি বলেন- স্বাধীনতার পর সত্তরের দশকে বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল ভিষণ প্রতিকূল রাজনৈতিক ও প্রাকৃতিক বাস্তবতার মধ্যে। এরপরও আজকের বাংলদেশ মানব উন্নয়নের সূচকগুলোতে অগ্রগতি এবং অন্তর্ভূক্তিমূলক উন্নয়নের বিবেচনায় সারা বিশ্বের জন্য অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত। একেবারে শুরু থেকেই নিজস্ব চিন্তা-ভাবনার জায়গা থেকে আর্থিক সেবা, কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশে যে সমস্ব সৃজনশীল উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে সেগুলোই দীর্ঘ মেয়াদে সাবির্ক উন্নয়নের ভিত্তি রচনা করেছে। এখানে উদ্যোক্তাদের বিকাশের জন্য যথেষ্ট সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাপকভিত্তিক প্রণোদনা দেয়া হয়েছে এবং এর ফলে তারা দেশের উন্নয়ন যাত্রাকে আরও বেশি অন্তর্ভূক্তিমূলক করতে এবং বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছেন। 

বাংলাদেশ ব্যাংক বিগত কয়েক বছর যাবত দেশের আর্থিক খাতে সৃজনশীল এবং ক্ষমতায়নের উদ্যোগগুলোকে উৎসাহিত করে আসছে। এক্ষেত্রে কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, নারী উদ্যোক্তা, গ্রীন ফাইনান্স এবং সিএসআর-এর দিকে বিশেষ মনযোগ দেয়া হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়ায় ‘করার মাধ্যমে শেখা’র কৌশল অনুসরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি সকল স্টেকহোল্ডারের সাথে মতবিনিময়ের মাধ্যমে এগুনো এবং ব্যাংক ও ক্ষুদ্র ঋণ সংস্থার মধ্যে কৌশলগত অংশীদরিত্বের উপর জোর দেয়া হয়েছে। এভাবে আর্থিক অন্তর্ভূক্তি প্রসারে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ব্যাংকভিত্তিক মোবাইল ফাইনান্সিয়াল সার্ভিসের কথা। বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকর নেতৃত্বে কারণে মাত্র পাঁচ ছয় বছরের মধ্যেই এক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় সাফল্য এসেছে। বর্তমানে ৪০ লাখেরও বেশি মানুষ মোবাইল ফাইনান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহার করছেন এবং প্রায় দশ লক্ষ এজেন্টের মাধ্যমে এ সেবা দেয়া হচ্ছে, আর ফল স্বরূপ কার্যত দেশের সকল স্তরের মানুষের কাছে আর্থিক সেবা পৌঁছে দেয়া সম্ভব হয়েছে, এর মধ্যে সাধারণত যাদেরকে আর্থিক সেবার আওতায় নিয়ে আসা কঠিন মনে করা হয় তারাও রয়েছেন। এজেন্ট ব্যাংকিং এরকম আরেকটি ডিজিটাল প্রযুক্তি নির্ভর সৃজনশীল আর্থিক সেবা। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নিয়মিত কর্ম ঘণ্টার বাইরেও স্বল্প আয়ের মানুষদের বিশেষত গার্মেন্ট শ্রমিকদের জন্য সহজে ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে। বেশ কিছু কারণে বাংলাদেশে মোবাইল ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের দ্রুত প্রসার ঘটেছে। এগুলো হলো- এদেশের অর্থনীতি প্রধানত নগদ আদান-প্রদান নির্ভর, দেশের অভ্যন্তরে বিপুল পরিমাণ অর্থ এক জেলা থেকে অন্য জেলায় পাঠানো হয়ে থাকে, এখানে দ্রুত নগরায়ন ও শিল্পায়ন ঘটছে, এবং সর্বোপরি এখানে ডিজিটাল প্রযুক্তি নির্ভর আর্থিক সেবার বাজার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যথাযথ নিয়ন্ত্রণের আওতায় রয়েছে। তবে এ কথা মানতেই হবে এখনো সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। 

যেমন: ডিজিটাল পদ্ধতিতে অর্থ আদান-প্রদানের প্রক্রিয়াকে শতভাগ নিরাপদ করে তুলতে হবে, বিভিন্ন মেবাইল ব্যাংকিং সেবাদানকারিদের মধ্যে সমন্বয়করণ, সেবা প্রদানের সাথে যুক্ত সরকারি-বেসরকারি পক্ষগুলোর মধ্যে লভ্যাংশ ভাগাভাগির প্রশ্নে ঐক্যমত্যে পৌঁছা ইত্যাদি। আগামী দিনে মোবাইল ফোনে ফোর জি প্রযুক্তির প্রসার ঘটলে আর্থিক খাতসহ অন্যান্য সেবা খাতগুলোও প্রধানত মোবাইল ফোন নির্ভর হয়ে উঠবে। কাজেই আর্থিক খাতের ডিজিটাল রূপান্তরকে একটি প্রধান অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করতে হবে, যাতে করে ডিজিটাল রূপান্তরের মাধ্যমে গণতান্ত্রিকীকরণের প্রক্রিয়াটি অব্যাহত থাকে। একথা অনস্বীকার্য যে আগামী বছরগুলোতে মোবাইল ফাইনান্সিয়াল সার্ভিসের প্রসারের ফলে অন্যান্য সেবা খাতগুলোর পরিবর্তন অব্যাহত থাকবে।

সভাপতির বক্তব্যে ড. সেলিম জাহান আর্থিক অন্তর্ভূক্তি নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং সহকর্মীদের বিশ্বের যেখানেই এ ধরনের প্রশংসনীয় উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে তার সুফলগুলো লিপিবদ্ধ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এসডিজির মূল চেতনা হলো- “কাউকে পেছনে না ফেলে এগুনো”, আর এই চেতনার জায়গা থেকেই আর্থিক অন্তর্ভূক্তি নিশ্চিত করার সফল উদ্যোগগুলোকে সকলের সামনে তুলে ধরা দরকার।

/ইউডি/