• বুধবার, ১৭ আষাঢ় ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ২৮ জুন ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অব্যবস্থাপনায় তৎপর সিন্ডিকেট

চালবাজিতেই বাড়ছে চালের দাম

প্রকাশ:  ২০ জুন ২০১৭, ০৫:০০ | আপডেট : ২০ জুন ২০১৭, ০৫:০৯
বিশেষ প্রতিনিধি

চালের দাম বাড়ছে তো বাড়ছেই। বিশেষ করে গত তিন মাসে হু হু করে বেড়ে গেছে চালের দাম। সরবরাহে ঘাটতি না থাকলেও পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে দেশের বাজারে সব ধরনের চালের দাম বেড়েই চলেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চালের চাহিদা ও জোগানে ভারসাম্য রাখতে  খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব মজুদ গড়ে তুলতে না পারার সুযোগটি  ব্যবসায়ীরা কাজে লাগচ্ছেন। সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের চালবাজিতে বাজারে চালের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে চালের দাম বাড়ানো হচ্ছে, আর চাল আমদানি নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় সংকট বাড়ছে। 

গত তিন মাস ধরে রাজধানীর পাইকারি বাজারে সব ধরনের চালের দাম কেজি প্রতি ৮ টাকা থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। তিনমাস আগে বাজারে মিনিকেট চাল বিক্রি হয়েছে প্রতি কেজি ৪৫ টাকায়, বর্তমানে এর দাম ৫৩ থেকে ৫৫ টাকা। ৪৮ টাকা দরের নাজিরশাইলে বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায়। তিন মাস আগেও গরীবের মোটা সেদ্ধ চালের দর ছিল প্রতি কেজি ৩৫/৩৬ টাকা, বর্তমানে এর দাম বেড়ে হয়েছে ৪৫ টাকা। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) পরিসংখ্যানে দেখানো হয়েছে, গত এক বছরের ব্যবধানে মোটা চালের দাম বেড়েছে ১২ শতাংশ। আর মাসিক মূল্যের ভিত্তিতে মোটা চালের দাম বেড়েছে ১.৩৭ শতাংশ। বছর ভিত্তিতে টিসিবি দেখিয়েছে এক বছর আগে এ চালের কেজিপ্রতি দাম ছিল ৩২ থেকে ৩৪  টাকা। আর বর্তমানে এ চালের কেজিপ্রতি দাম ছিল ৩৬ থেকে ৩৮ টাকা।যদিও  খুচরা বাজারে মোট চাল এখল ৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। 

চালের এই অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির কারণ হিসেবে পাইকারী ব্যবসায়ীরা বলছেন, হাওরাঞ্চলসহ সারাদেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যার পানিতে ফসলের ক্ষতির প্রভাব পড়েছে চালের বাজারে।, মিলারদের মজুদ প্রবণতাকেও তার চালের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে দায়ী করে তারা দাবি করছেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ না থাকায় চালের বাজারে এই সংকট তৈরি হয়েছে। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থাপনাগত ভুলেই চালের বাজারে সংকট সৃষ্টি হয়েছে । আইনে চাল মজুদের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ ও সময় নির্ধারিত থাকলেও তা পরিপালনে ব্যবসায়ীদের বাধ্য করতে পারেনি খাদ্য মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি সরকারী চালের মজুদ  সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসায় তৎপর হয়েছে অসাধু মজুদদার সিন্ডিকেট। তাদের চালবাজিতেই পাইকারী বাজের চালের সরবরাহ কমিয়ে কৃত্রিমভাবে সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানো হচ্ছে। 

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চালের মজুদ এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ১৫ জুন পর্যন্ত সরকারি গুদামে খাদ্যশস্যের মোট মজুদ ছিল ৪ লাখ ৯৬ হাজার টন। এর মধ্যে চালের মজুদ ১ লাখ ৯০ হাজার টন। অথচ গত বছরের একই সময়ে সরকারের গুদামে মজুদ আকারে চাল ছিল ৬ লাখ ৬ হাজার টন।

খাদ্য মন্ত্রণালয়  মিলারদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সংগ্রহ করতে পারেনি। চলতি বোরো মৌসুমে ৩৪ টাকা দরে আট লাখ টন চাল কেনার পরিকল্পনা গ্রহণ করে খাদ্য মন্ত্রণালয়। গত ২ মে শুরু হওয়া এ কর্মসূচির আওতায় ১৫ জুন পর্যন্ত চাল (সিদ্ধ ও আতপ) সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ৩২ হাজার ২৯৬ টন। এতে টান পড়েছে সরকারের মজুদে।

যদিও পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীরা যাতে চালের বাজারে সংকট সৃষ্টি করতে না পারে, সেজন্যও সুনির্দিষ্ট আইন আছে। কন্ট্রোল অব এসেনশিয়াল কমোডিটিজ অ্যাক্ট ১৯৫৬-এর সেকশন ৩-এর ক্ষমতাবলে মজুদের পরিমাণ ও মেয়াদ নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। আইন অনুযায়ী সরকার বা সরকার কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ প্রদত্ত লাইসেন্স ব্যতিরেকে কোনো ব্যবসায়ীর এক টনের বেশি খাদ্যশস্য তার অধিকারে বা নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ নেই। অনুমোদিত এ মেয়াদের মধ্যে মজুদকৃত চাল ব্যবসায়ীরা বিক্রি করছেন কিনা, তা তদারকির দায়িত্ব খাদ্য মন্ত্রণালয়ের। কোনো কারণে অনুমোদিত মেয়াদে নিয়ন্ত্রণে থাকা পণ্য কোনো ব্যবসায়ী বিক্রি করতে না পারলে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার তিনদিনের মধ্যে সরকারের ক্ষমতাপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার তা অবগত হওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এক্ষেত্রেও ব্যর্থ হয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। চাল সংগ্রহ ও মজুদ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অনেকেই এর ব্যত্যয় ঘটাচ্ছেন বলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে। অস্বাভাবিক দামে চাল বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা।

চালের মূল্য বৃদ্ধি প্রসঙ্গে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন দাবি করেন, চালের বাজারে কোনো সংকট না থাকলেও নিয়মিত দাম বাড়াচ্ছে ব্যবসায়ীরা। দাম বাড়াতে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ী বিভিন্ন অজুহাত দেখাচ্ছে। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে উৎপাদিত চালেই দেশের চাহিদা পূরণ হচ্ছে। এ সময় চালের দাম বাড়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। তবে বাজার মনিটরিং না থাকায় চালের দাম বাড়াচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। নিয়মিত মনিটরিং হলে চালসহ সব পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে উত্তরবঙ্গের চাল ব্যবসায়ীদের সব সিন্ডিকেট ভেঙ্গে দিতে হবে। বর্তমানে তারাই চালের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজারে দাম বাড়াচ্ছে। সরকারি পর্যায়ে বাজার মনিটরিং শুরু হলে চালসহ সব ধরনের পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, হঠাৎ করেই চালের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির ঘটনায় সরকারের এরই মধ্যে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা সারা দেশে ‘কড়া নজরদারি’ শুরু করেছে। তবে এখন পর্যন্ত মজুদদার চক্রকে চিহ্নিত করা যায়নি, অতিরিক্ত ধান-চাল মজুদ রাখার ঘটনাও উদ্ঘাটিত হয়নি।

চালের বাজারের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার এরই মধ্যে তৎপর হয়েছে বলে জানিয়েছেন খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. কায়কোবাদ হোসেন। গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ কার্যকর হলে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হবে বলে দাবি করে তিনি বলেন, দেশের ভেতরে কম মজুদ ও বেশি দামের প্রেক্ষাপটে খাদ্য মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে চাল কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। ভিয়েতনাম থেকে আড়াই লাখ টন চাল ২০ দিনের মধ্যে আসতে পারে। এর বাইরে দেড় লাখ টন চাল আমদানির জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরো সাত লাখ টন চাল আমদানি করা হবে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড থেকে চাল আমদানি কার্যক্রম শুরু হলে মজুদ বেড়ে যাবে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ভারত ও থাইল্যান্ড সরকারের কাছেও চাল আমদানির আগ্রহ জানিয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। এছাড়া চাল আমদানিতে শুল্ক কমানোর প্রস্তাব কার্যকর হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।