• বুধবার, ১৭ আষাঢ় ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ২৮ জুন ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ

নেতাদের কাছ থেকে বাংলাদেশের মানুষের আরো ভালো কিছু প্রাপ্য

প্রকাশ:  ২০ জুন ২০১৭, ০০:২২
পূর্বপশ্চিম ডেস্ক

গত সপ্তাহে ভারতের কাছে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনালে হেরে বিদায় নিলেও, টুর্নামেন্টজুড়ে বাংলাদেশের দুর্দান্ত খেলা দলটির নজরকাড়া অগ্রগতি নির্দেশ করে। আর দলটি প্রাপ্য প্রশংসাও পেয়েছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করা তুলনামূলক নবীন এই দেশটি স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে বড় জয় পেলেও সাধারণত কমই স্বীকৃতি পায়। উপনিবেশবাদ ও স্বাধীনতা যুদ্ধের জেরসহ বাধাবিঘ্ন আছে প্রচুর। আছে ব-দ্বীপটিতে জেঁকে থাকা বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম জনসংখ্যাকে নিরাপদে আগলে রাখার চ্যালেঞ্জও। এইতো গত সপ্তাহে বন্যা ও ভূমিধ্বসে কমপক্ষে ১৫০ জন মারা গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরপরও উন্নততর আশ্রয়কেন্দ্র ও সতর্কীকরণ পদ্ধতির মাধ্যমে সাইক্লোনে মৃতের সংখ্যা কমিয়ে এনেছে দেশটি। স্বাস্থ্য, সাক্ষরতা ও দারিদ্র্য দূরীকরণে দারুণ অগ্রগতি করেছে।

দেশটির সবচেয়ে বড় শত্রু হলো সম্ভবত নিজ রাজনীতিকদের নির্বুদ্ধিতা। এরা এক ভয়ানক ও নিষ্ফল বৈরিতায় আটকে আছে। এই বৈরিতায় বহু প্রাণ ঝরেছে। তছনছ হয়েছে দেশকে শক্তিশালী করার সুযোগ। ১৯৯১ সালের পর থেকে দেশের নেতৃত্ব ঘুরপাক খেয়েছে আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মধ্যে। উভয় দলই পরিবারতান্ত্রিক দুই নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে। ২০১৪ সালের সর্বশেষ নির্বাচনে ব্যাপক সহিংসতার ক্ষত লেগে আছে। নির্বাচনের পর বিরোধী দলের ওপর আরো আক্রমণ হয়েছে।

খুব কম মানুষই বিশ্বাস করেন যে, খালেদা জিয়া এবং তার ছেলে ও উত্তরাধিকারী তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মামলার নেপথ্যে রাজনীতি কাজ করেনি। এ মাসের শুরুর দিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মওদুদ আহমদ ও তার স্ত্রী হাসনা জসিমুদ্দিন মওদুদকে তাদের বাড়ি থেকে উৎখাত করা হয়েছে। আদালতের নির্দেশে এটি জব্দ করার পর এ পদক্ষেপ নেয়া হয়।
মওদুদ আহমদ (৭৭) শুধু বিএনপি নেতাই নন। তিনি একজন আইনজীবী যিনি স্বাধীনতা পূর্বকালে শেখ হাসিনার পিতা ও দেশের প্রতিষ্ঠাতা নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, যখন তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান তাকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত করে। এটিই দেখিয়ে দিয়েছে, বিভক্তিতে আচ্ছন্ন হয়ে ও অভিন্ন স্বার্থ অগ্রাহ্য করে বাংলাদেশের নেতারা কিভাবে দেশের আদি প্রত্যাশাকে নষ্ট করেছেন।

রাজনৈতিক আঙ্গিনা ছাড়িয়েও এই দমনপীড়নের আঁচ পাওয়া যায়। লেখক, শিক্ষাবিদ ও অ্যাক্টিভিস্টদের মধ্যকার ভিন্নমতধারীদেরও লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে সরকার। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির চার বছর পরও, আন্তর্জাতিক পোশাক ব্রান্ডগুলো শ্রমিক ইউনিয়নকে টার্গেট করা নিয়ে অভিযোগ করছে।

অপরদিকে, বিদ্বেষ ও সন্দেহের আবহের মধ্যে সহিংস ইসলামী চরমপন্থা বিস্তার লাভ করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও চরমপন্থা বিস্তার লাভের ভারে জর্জরিত। উদারপন্থি ব্লগার, শিক্ষাবিদ ও সংখ্যালঘু হত্যাকাণ্ডের পর পদক্ষেপ নিতে লজ্জাজনকভাবে ব্যর্থ হওয়ার পর, গত বছর ঢাকার একটি ক্যাফেতে জঙ্গিদের হাতে ২০ জিম্মি নিহত হলে সরকার অবশেষে সমস্যাটি মোকাবিলার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু এরপরও, নির্বাচনের ১৮ মাস বাকি থাকতে, আওয়ামী লীগ দৃশ্যত রক্ষণশীল শক্তিগুলোকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করছে। কারণ, দলটি ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে ভোটের জন্য আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে। দৃশ্যত, বিরোধী পক্ষ হলো এই ভোটারদের গতানুগতিক শিবির। বিরোধী পক্ষকে এই ভোটারদের কাছ থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে সরকার।

উভয় দলের উচিত গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকার নিয়ে পুনরায় সক্রিয় হওয়া। পেশীশক্তির ব্যবহার ও অসহিষ্ণুতার দিকে ঝোঁকা থেকে বিরত থেকে জনগণের চাহিদার দিকে তাদের নজর দেয়া উচিত। কোটি মানুষ এখনও দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করে। জলবায়ু পরিবর্তন একটি অত্যাসন্ন হুমকি। রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ও রেমিট্যান্স কমছে। গার্মেন্ট খাতের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা দেশটিকে বহি:অর্থনৈতিক দুরবস্থার শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলেছে।

বাংলাদেশের মানুষ যা পেয়েছে, প্রত্যেকটি জিনিসের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছে। নিজেদের নেতাদের কাছ থেকে তাদের অনেক ভালো কিছু প্রাপ্য।

(রোববার বৃটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ: দ্য পিপল ডিজার্ভ বেটার’ শীর্ষক সম্পাদকীয়ের অনুবাদ।)