• বুধবার, ১৭ আষাঢ় ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ২৮ জুন ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ

কালা এতিমের টাকা চুরি করে সম্পদ গড়ে কানাডায়, তার বউ ডুবে ফতোয়ায়

প্রকাশ:  ২০ জুন ২০১৭, ০০:৫৩ | আপডেট : ২০ জুন ২০১৭, ২০:০০
খুজিস্তা নূর-ই নাহারিন (মুন্নি)

কানাডাতে আমার অখণ্ড অবসর। দেশ আর বিদেশে ১২ ঘণ্টা সময়ের ব্যবধানে রাত-দিনের মত করে আমার জীবনেও বৈপরীত্য। এখানে কেবলই রান্না-বান্না, ঘরকন্যা আর আদরের দুই সন্তানের সাথে বেহিসেবি গল্প গুজব আর আনন্দে মেতে উঠা।

এবার আমার প্রজেক্টই হচ্ছে দুই সন্তানকেই রান্না-বান্না, ঘর পরিষ্কারে পারদর্শী অর্থাৎ এক্সপার্ট করে গড়ে তোলা। কেবল লেখা-পড়া, এটিকেট, মেনারস জানলেই হবে না জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে নিজেকে স্বাবলম্বী হতে হবে। ঘর পরিষ্কার, চুলা পরিষ্কার, বাথরুম পরিষ্কারও জীবনের অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজন গুলোর মধ্যেই পরে। যে গুলো জানা ছাড়া বিদেশ বিভূঁইয়ে জীবন প্রায় অচল।

যে কোন পরিবেশ আর পরিস্থিতিতে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সাথে মিশতে পারা, সামাজিকতাও একটি বিশেষ গুণ। আমরা তিন জন ভাগাভাগি করে বাজার করি, রান্না করি, ঘর দোর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করি। নিজের কাজ নিজে করাতে কোন লজ্জা নেই, স্বয়ং সম্পূর্ণ এবং স্বনির্ভর হতে পারাটা অবশ্যই গৌরবের।

দূর থেকে অনেকেই মনে করেন ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা মানেই স্বল্প বসনা, মদ আর ড্রাগের বাহুল্য, অবাধ মেলামেশা, লিভটুগেদার নয়তো ফ্রি সেক্স। কিন্তু এখানে প্রতিটি সন্তানকে যে পরিমাণ কষ্ট করে বড় হতে হয় পরবর্তীতে জীবনের বাস্তবতায় কষাঘাতে নিজেই নিজেকে তৈরি করে নিতে হয়। কারণ মুখে মুখে উদার উন্মুক্ত বলে যত কথাই শুনি রেসিজম বা বর্ণ বিভ্রাট এখনও মারাত্মক। তাই জীবন বড় কঠিন প্রতিটি মুহূর্তেই সাফল্যের জন্য প্রতিযোগিতা করে করে টিকে থাকা।

এখানকার মেয়েরা শর্টস পরে, খোলা কাপড় চোপড় পরে ঠিকই কিন্তু কেউ তাঁদের দেখছে কিনা কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। কারণ তাঁরা দেখানোর জন্য নয় অভ্যস্ততায় জীবন যাত্রাকে সহজ করার জন্য পরে। কোন পুরুষ ওদের দিকে আড় চোখে তাকাবে সেই ফুরসৎ নেই আবার মানসিকতাও নেই। আমাদের দেশে আইন আছে কিন্তু প্রয়োগ নেই কিন্তু এসব দেশে নারীদের পক্ষে শক্ত আইন, কোন অবস্থাতেই রক্ষে নেই।

তবে এদেশের ছেলে মেয়েরা অনেক বেশি মানবিক, অনেক বেশি ভদ্র, অনেক বেশি কর্মঠও । এরা মানুষকে মায়া করে, পশু পাখীকে মায়া করে, মিথ্যে বলে না, কুটনামো, পিঠ পিছে বদনাম করাকে ঘৃণা করে। অন্যকে ঠকিয়ে বা চিট করাকে গর্হিত অপরাধ বলে মনে করে। অন্যের সম্পদে বা অন্যের সুখে ঈর্ষা নেই যার যা আছে তাই নিয়েই সবাই সুখী হতে চায়। এই যে জীবনবোধ এটাই তো সবচেয়ে বড় ধর্ম! তবে কেন বৃথাই চিন্তা, ‘সন্তান যেন পথ ভ্রষ্ট না হয়’।

তবে বাংলাদেশে ‘হলিআর্টিজেন’ দুর্ঘটনার পর সমগ্র পৃথিবীতেই বাংলাদেশি যুবক বয়সী ছাত্রদের ভিতর এক ধরনের আতঙ্কগ্রস্থতা কাজ করছে। এমনিতেই বাংলাদেশি, তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশের নাগরিক তাঁর উপর আবার মুসলিম। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যে কারণ গুলো হতে পারতো গর্বের সেইসব কারণ গুলো, গভীর ভালবাসায় আর নির্ভরতায় আমাদের উচ্চারিত মুসলিম পরিবারের সেই শব্দ গুলো যেন আজ লজ্জা আর ভয়ের। বর্তমান সময়ের বাস্তবতায় আইএস পৃথিবীর বুকে মুসলমানদের সম্মান, বিশ্বাস যোগ্যতা, নির্ভরতা, অহংকারের জায়গাটিকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।

আমরা তিনজন একসাথে বসে ইউটিউবে বিভিন্ন মজার জিনিস দেখছিলাম। দেখতে দেখতে বাংলাদেশের একটি যুবক ছেলে কিভাবে দৈহিক ভিন্নতায় শারীরিক কসরতের মাধ্যমে অন্যদের বোকা বানায় দেখছিলাম। ছেলেটির প্রফেশন হচ্ছে ভিক্ষা বৃত্তি। ছেলেটি গর্বের সাথে তাঁর জীবনের ধোঁকা দেওয়ার গল্প গুলো নির্দ্বিধায় একে একে বলে যাচ্ছে। সে বলছে হাজার হাজার টাকা আয়, মাঝে মাঝে সে বিদেশেও যায়। গ্রামে পাকা দালান বাড়ি, দামী হোটেলে রাত্রি যাপন, দামী খাবার খায়। দেখতে দেখতে তন্ময় হয়ে ভাবছিলাম মানুষের সাথে মানুষের কত মিল! বগুড়ার ‘কালা’, সেও তো ঠিক এমনি ভাবেই বাংলাদেশে কেঁদে কেটে নাকের পানি চোখের পানি মুছে গলার স্বর উঁচু-নিচু করে আমাদেরকে বোকা বানিয়েছে , এখনও আরও অনেককে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টায় আছে। অথচ কানাডায় বাংলাদেশিদের মাঝে সম্পদশালীদের একজন। ব্যাংক চোর, বড় বড় গার্মেন্টস ব্যবসায়িদের সাথে টেক্কা দিয়ে চলে। শুনেছি দেশের বড় বড় ব্যবসায়িরা নাকি ওকে কাছে ভিড়তে দেয়নি। কিন্তু অসৎ কর্মচারীদের যোগসাজশে ব্যাংক লুণ্ঠন অব্যাহত আছে। সাথে জুটেছে পিরোজ পুরের সেই অসৎ বাটপার বুড়ো।

বাংলাদেশি অধ্যুষিত ডেনফোরডে এক দাওয়াতে একজন বলছিলেন,  ‘আপা, দেশের ব্যাংক গুলা মনে হয় খালি হইয়া গেছে, আর দেশ থাইকা ভালো মানুষগুলোর সাথে কিছু চোর বাটপারও কানাডায় আসছে, তাঁদের ডাঁটের ঠেলায় থাকা দায়’।

কষ্টার্জিত অর্থ আর সম্পদের কোন শব্দ হয় না কিন্তু চুরির টাকার গরম থাকাটা, ঝম ঝম আওয়াজ হওয়াটা স্বাভাবিক। দু’দিন পর পর হজ্ব করতে যায়, মাথার ঘুমটা না ফেলা, হালাল খাবার ছাড়া মুখে না তুলা, কথায় কথায় আলহামদুলিল্লাহ্‌, মাশাআল্লাহ্‌, সুবহানাল্লাহ বলা, সার্বক্ষণিক নিজেকে সাক্ষাত আল্লাহ্‌র দূত হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টায় রত। শুনে মনে হয় যেন কানাডার মত স্বর্গেও সিট রিজার্ভ আছে। অথচ সমস্ত পক্রিয়াই সম্পন্ন করে ‘হারাম’ পথে উপার্জিত অর্থ দিয়ে, অসহায় এতিম বাচ্চাদুটিকে ঠকিয়ে ওদের সম্পদ লুণ্ঠন করে। তবুও দোয়া করি মানুষের মাঝে তাঁর সত্যিকারের ঈমান জাগরিত হোক সম্বিৎ ফিরে পাক।

লেখক: সম্পাদক, পূর্বপশ্চিমবিডি.নিউজ