• বুধবার, ১৭ আষাঢ় ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ২৮ জুন ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ

ভোলায় জোয়ার এলেই পানিবন্দি অর্ধলক্ষাধিক মানুষ

প্রকাশ:  ১৩ জুন ২০১৭, ১৬:৪৯ | আপডেট : ১৩ জুন ২০১৭, ১৮:৪৩
অচিন্ত্য মজুমদার, ভোলা ॥

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্মচাপের প্রভাবে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদীর পানি। গত দুইদিন ধরে নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় এবং ঝড়ো বাতাসের সাথে অবিরাম বর্ষায় জেলার বিভিন্ন পয়েন্টে বেড়িবাঁধ ঝুকির মধ্যে রয়েছে।

জোয়ার এলেই পানি ঢুকে মনপুরা, দৌলতখান, বোরহানউদ্দিন, তজুমদ্দিন ও চরফ্যাশন উপজেলার নিম্মাঞ্চল এবং চরাঞ্চলের অর্ধলক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পরে। তলিয়ে যায় ভোলার ইলিশা ফেরিঘাটের পন্টুন। ফলে এসব এলাকার মানুষ কাজ করছে জেয়ার ভাটার উপর নির্ভর করে। 

সরেজমিনে মঙ্গলবার জেলার বিভিন্ন উপজেলা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর পানি অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় ও অবিরাম বৃষ্টিতে দৌলতখান উপজেলার ভবানীপুর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বেড়িবাঁধ ধ্বসে গেছে। ঘূর্ণিঝড় মোড়ার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধটি ভেঙে যাওয়ায় জোয়ার এলেই বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। ভোলা-২ আসনের এমপি আলী আজম মুকুলের নির্দেশে দৌলতখান উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র ও ইউএনও ঘটনাস্থলে পরিদর্শন করে বেড়িবাঁধ মেরামতের কাজে তদারকি করছেন।

এ ব্যাপারে দৌলতখান উপজেলা চেয়ারম্যান মঞ্জুর আলম খাঁন বলেন, অস্বাভাবিক পানির কারণে বেড়িবাঁধের ১৬ শতাংশের মধ্যে ১৪ শতাংশই ধ্বসে গেছে। এতে মানুষ আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। চরম হুমকির মধ্যে রয়েছে পাউবোর এ বেড়িবাঁধটি। যেকোনো সময় সম্পূর্ণ বাঁধটি ভেঙে গিয়ে বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। জোয়ারের পানিতে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার নিম্মাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।

তবে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহি প্রকৌশলী বাবুল আখতার জানান, বেড়িবাঁধ ভেঙে গেলেও সেখানে পানি ঢুকেনি। আর ক্ষতিগ্রস্ত অংশ সংস্কারের কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।

অপরদিকে তজুমুদ্দিন উপজেলার চৌমুহনী পয়েন্টে ৩শ’ মিটার বাঁধ ভেঙে সাত গ্রামের বসতবাড়ী এবং বিস্তীর্ণ মাঠের ফসল তলিয়ে গেছে। এসব এলাকার মানুষ জোয়ার ভাটার উপর নির্ভর করে বসবাস করছে। সোমবার বিকেলে ত্রাণ সাহায্য নিয়ে ওই এলাকার ভাঙন পরিদর্শন করতে আসেন ভোলা-২ আসনের সংসদ সদস্য নুরুন্নবি চৌধুরী শাওন। এসময় তিনি দুর্গতদের মাঝে চাউল ও নগদ অর্থ বিতরণ করেন। 

এদিকে মনপুরা উপজেলার ১ নম্বর মনপুরা ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজার সংলগ্ন পশ্চিম পাশে এবং হাজিরহাট ইউনিয়নের পূর্ব সোনার চর এলাকায় ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানি ঢুকে ওই এলাকার চরাঞ্চলের ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। পানিতে নলকূপ ও পুকুর ডুবে যাওয়ায় ওই এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে।

মনপুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোহাগ হাওলাদার জানান, তিনি পানিবন্দি এলাকা পরিদর্শন শেষে বিষয়টি জেলা প্রশাসককে জানিয়েছেন। বোরহানউদ্দিন উপজেলার হাসাননগর ইউনিয়নের হাকিমুদ্দিন লঞ্চঘাট ও বাজারসহ অন্তত ৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে ৫ সহস্রাধিক মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। ঘাটে থাকা বিআইডব্লিউটিএ’র দীর্ঘদিনের জরাজীর্ণ পন্টুনটি নদীর পানিতে ডুবে যায়। এতে চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন লঞ্চযাত্রী, বাজার ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা।

লঞ্চঘাটের দায়িত্বরত ইজারাদার মোঃ নুরু মিয়া জানান, সরকারিভাবে নতুন পন্টুন স্থাপন না করায় মেঘনার প্রবল স্রোতে ও লঞ্চের প্রচণ্ড ধাক্কায় ব্যবহার অনুপযোগী লক্কর-ঝক্কর এ পন্টুনটি এখন ব্যবহার করতে হচ্ছে।

হাকিমুদ্দিন বাজারের ব্যবসায়ী নুরে আলম জানান, জোয়ারের পানিতে তার ব্যবসায়ী মালামাল সব ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। তার মত অনেক ব্যবসায়ীর মালামাল ভিজে।

এদিকে ওই উপজেলার কুতুবা ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড সংলগ্ন এলাকায় তেঁতুলিয়া নদীর স্রোতের তোড়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধের প্রায় ৫টি পয়েন্টে ধ্বসে যায়। এতে হুমকির মুখে পড়েছে ওই এলাকার ঐতিহ্যবাহী প্রাচীনতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছোট মানিকা সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা। প্রাচীন এ প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানের সাত শতাধিক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কিত মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ মোঃ হাবিবুর রহমান।

তিনি জানান, মাদ্রাসাটি একেবারেই নদীর কাছাকাছি এসে পড়েছে।

কুতুবা ইউপি চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান জোবায়েদ জানান, বিষয়টি তিনি পাউবো কর্মকর্তাদেরকে অবহিত করেছেন। বোরহানউদ্দিনের পৌর মেয়র ও ছোট মানিকা সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার সভাপতি রফিকুল ইসলাম প্রতিষ্ঠান ও এলাকাবাসীকে বাঁচাতে অবিলম্বে তিনি বেড়িবাঁধ সংস্কার করে ব্লকবাঁধ নির্মাণের দাবি জানান।   

জোয়ারের পানিতে চরফ্যাশনের নিম্মাঞ্চল এবং চরাঞ্চলের ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে ভোলার ইলিশা ফেরিঘাটের পন্টুন। এতে করে ওই ঘাট দিয়ে ভোলা-লক্ষ্মীপুর রুটের যানবাহন ঠিকমত ওঠা-নামা করতে পারছে না। ফলে ভোগান্তির মধ্যে পড়েছে যাত্রী, যান চালক ও শ্রমিকরা। পারাপারের অপেক্ষায় রয়েছে উভয় পাড়ের শতাধিক যানবাহন।

এ ব্যাপারে ভোলা-লক্ষ্মীপুর রুটের ফেরির ব্যবস্থাপক আবু আলম বলেন, আমি বিষয়টি বিআইডব্লিউটিএ’র উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।  

এসএম